ড্রোন প্রতিযোগিতায় বিশ্বে চতুর্থ ইউআইইউ, বাংলাদেশের নতুন ইতিহাস
বার্তা বিভাগ
প্রকাশিত: ২০ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ৮:৩৯ পূর্বাহ্ণ
প্রতিবেদকের সকল নিউজ
ছবিতে প্রতিযোগিতায় অংগ্রহনকারীরা
নিজস্ব প্রতিবেদক | যোগফল অনলাইন :
আন্তর্জাতিক ড্রোন ও স্বয়ংক্রিয় উড়োজাহাজ প্রযুক্তির প্রতিযোগিতায় নতুন ইতিহাস গড়েছে বাংলাদেশের ইউনাইটেড ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি (ইউআইইউ)। যুক্তরাষ্ট্রে অনুষ্ঠিত স্টুডেন্ট আনম্যানড এরিয়াল সিস্টেমস (এসইউএএস) ২০২৬ প্রতিযোগিতায় বিশ্বে চতুর্থ স্থান অর্জন করেছে ইউআইইউ’র এরিয়াল রোবোটিক্স টিম (ইউএআরটি)।
আন্তর্জাতিক পর্যায়ের মর্যাদাপূর্ণ এ প্রতিযোগিতায় প্রথমবার অংশ নিয়েই বাংলাদেশের কোনো দল হিসেবে পোডিয়ামে স্থান করে নেওয়ার কৃতিত্ব অর্জন করেছে ইউআইইউ’র ইউএআরটি। বিশ্ববিদ্যালয়টির এই সাফল্য দেশের উচ্চশিক্ষা, গবেষণা, রোবোটিক্স ও ড্রোন প্রযুক্তির ক্ষেত্রে একটি উল্লেখযোগ্য মাইলফলক হিসেবে দেখা হচ্ছে।
২০২৬ সালের এসইউএএস প্রতিযোগিতার চূড়ান্ত পর্ব গত ১৪ থেকে ১৭ সেপ্টেম্বর যুক্তরাষ্ট্রের ওকলাহোমা অঙ্গরাজ্যের টালসায় অবস্থিত স্কাইওয়ে রেঞ্জে অনুষ্ঠিত হয়। চার দিনব্যাপী এ প্রতিযোগিতায় বিশ্বের বিভিন্ন দেশের স্বনামধন্য বিশ্ববিদ্যালয় ও উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানের শীর্ষস্থানীয় দলগুলো অংশ নেয়।
প্রতিযোগিতায় প্রতিকূল আবহাওয়া, উচ্চ বাতাসের গতি এবং তাপমাত্রাজনিত নানা চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হতে হয় অংশগ্রহণকারী দলগুলোকে। কঠিন পরিস্থিতির মধ্যেও কৌশলগত সিদ্ধান্ত, প্রযুক্তিগত সমন্বয় ও দক্ষ পরিচালনার মাধ্যমে সফলভাবে মিশন সম্পন্ন করে ইউআইইউ’র ইউএআরটি এবং অর্জন করে বিশ্বে চতুর্থ স্থান।
৮১ দলের প্রতিযোগিতায় চতুর্থ ইউআইইউ
২০০৩ সাল থেকে নিয়মিত আয়োজিত হয়ে আসা এসইউএএস প্রতিযোগিতা বিশ্বের অন্যতম মর্যাদাপূর্ণ শিক্ষার্থীভিত্তিক আনম্যানড এরিয়াল সিস্টেমস প্রতিযোগিতা হিসেবে পরিচিত।
এবারের প্রতিযোগিতার প্রাথমিক পর্বে বিশ্বের বিভিন্ন দেশের ৮১টি দল অংশগ্রহণ করে। এর মধ্যে ৬৭টি দল চূড়ান্ত পর্বের ফ্লাইং প্রতিযোগিতার জন্য নির্বাচিত হয়। পরবর্তী ধাপে ৬৪টি দল ফ্লাইট রেডিনেস অনুমোদন পায়। শেষ পর্যন্ত ৫৮টি দল প্রতিযোগিতার ফ্লাইট পরিচালনায় অংশ নেয়।
প্রতিযোগিতার দিন প্রতিকূল আবহাওয়া অংশগ্রহণকারী দলগুলোর জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়ায়। উচ্চ বাতাসের গতি ও তাপমাত্রাজনিত সমস্যার কারণে ফ্লাইট পরিচালনাকারী দলগুলোর মধ্যে ২১টি দল ক্র্যাশের শিকার হয়।
এমন কঠিন পরিস্থিতিতেও ইউআইইউ’র ইউএআরটি দ্রুত কৌশল পরিবর্তন ও প্রয়োজনীয় প্রযুক্তিগত সমন্বয় করে তাদের নির্ধারিত মিশন সফলভাবে সম্পন্ন করে। এর মাধ্যমে তারা প্রতিযোগিতায় বিশ্বে চতুর্থ স্থান অর্জন করে।
বিশ্বখ্যাত বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর সঙ্গে প্রতিদ্বন্দ্বিতা
এসইউএএস ২০২৬-এ বিশ্বের বিভিন্ন খ্যাতনামা বিশ্ববিদ্যালয়ের দল অংশগ্রহণ করে। প্রতিযোগিতায় অংশ নেওয়া প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে ছিল কর্নেল ইউনিভার্সিটি, মোনাশ ইউনিভার্সিটি, দ্য ওহাইও স্টেট ইউনিভার্সিটি, ইউনিভার্সিটি অব মেরিল্যান্ড এবং ওয়ারশ ইউনিভার্সিটি অব টেকনোলজি-এর মতো আন্তর্জাতিকভাবে পরিচিত বিশ্ববিদ্যালয়।
এসব প্রতিষ্ঠানের শক্তিশালী দলগুলোর সঙ্গে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে বাংলাদেশের প্রতিনিধিত্বকারী ইউআইইউ’র ইউএআরটির চতুর্থ স্থান অর্জন দেশের প্রযুক্তিগত সক্ষমতার আন্তর্জাতিক স্বীকৃতির একটি গুরুত্বপূর্ণ দৃষ্টান্ত হিসেবে সামনে এসেছে।
নিরাপত্তা ও স্বয়ংক্রিয় মিশনে বিশেষ সাফল্য
প্রতিযোগিতায় ইউআইইউ’র এরিয়াল রোবোটিক্স টিম সেফটি ইন্সপেকশন ও র্যাপিড রেসপন্সে পূর্ণ নম্বর অর্জন করেছে।
এ ছাড়া প্রতিযোগিতায় ইউএআরটি একমাত্র দল হিসেবে সম্পূর্ণ স্বয়ংক্রিয়ভাবে মিশন সম্পন্ন করার কৃতিত্ব অর্জন করেছে বলে জানিয়েছে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ।
দলটির তৈরি স্বয়ংক্রিয় আনম্যানড এরিয়াল ভেহিকেলে রয়েছে একাধিক আধুনিক প্রযুক্তি। এর মধ্যে রয়েছে স্বয়ংক্রিয় নেভিগেশন, আকাশপথের মানচিত্র তৈরি, বস্তুর শনাক্তকরণ, পে-লোড সরবরাহ, বাধা শনাক্ত ও তা এড়িয়ে চলার সক্ষমতা এবং বিভিন্ন নিরাপত্তা ব্যবস্থা।
এই প্রযুক্তিগুলোর সমন্বিত প্রয়োগের মাধ্যমে প্রতিকূল পরিবেশেও নির্ধারিত মিশন পরিচালনা ও সফলভাবে সম্পন্ন করতে সক্ষম হয় ইউআইইউ’র দলটি।
দীর্ঘ গবেষণা ও প্রকৌশল উন্নয়নের ফল
ইউএআরটির এই আন্তর্জাতিক সাফল্যের পেছনে রয়েছে দীর্ঘদিনের গবেষণা, নকশা প্রণয়ন, প্রকৌশল উন্নয়ন, নির্মাণ, পরীক্ষা-নিরীক্ষা এবং ধারাবাহিক পরিমার্জনের সমন্বিত প্রচেষ্টা।
দলটির সদস্যরা স্বয়ংক্রিয় আনম্যানড এরিয়াল ভেহিকেল তৈরি ও এর বিভিন্ন প্রযুক্তিগত সক্ষমতা উন্নয়নে কাজ করেছেন। নেভিগেশন থেকে শুরু করে অবজেক্ট ডিটেকশন, ম্যাপিং, পে-লোড ডেলিভারি এবং বাধা এড়িয়ে চলার মতো জটিল প্রযুক্তি একই প্ল্যাটফর্মে সমন্বয় করা হয়েছে।
প্রতিযোগিতার বাস্তব পরিবেশে এসব প্রযুক্তির কার্যকারিতা পরীক্ষা করার পাশাপাশি আবহাওয়ার পরিবর্তন ও উচ্চ বাতাসের মতো পরিস্থিতিতে দ্রুত সিদ্ধান্ত গ্রহণ এবং প্রযুক্তিগত সমন্বয়ের সক্ষমতাও কাজে লাগিয়েছে দলটি।
বাংলাদেশের তরুণদের জন্য নতুন সম্ভাবনা
ইউআইইউ’র ইউএআরটির এই অর্জন বাংলাদেশের তরুণ প্রজন্মের মধ্যে রোবোটিক্স, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, ড্রোন প্রযুক্তি ও স্বয়ংক্রিয় ব্যবস্থা নিয়ে গবেষণার আগ্রহ আরও বাড়াবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
বিশ্ববিদ্যালয়টির পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, দূরদর্শী নেতৃত্ব, দক্ষ ফ্যাকাল্টি নির্দেশনা, শিক্ষার্থীদের মেধা ও উদ্ভাবনী শক্তি এবং প্রাতিষ্ঠানিক সহায়তার সমন্বিত প্রয়াসে বাংলাদেশও বিশ্বমঞ্চে প্রযুক্তিগত সক্ষমতার স্বাক্ষর রাখতে পারে—ইউএআরটির অর্জন তার একটি উদাহরণ।
বিশ্ববিদ্যালয়টির এ সাফল্য দেশের উচ্চশিক্ষা ও গবেষণা খাতের জন্যও তাৎপর্যপূর্ণ। বিশেষ করে রোবোটিক্স, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, স্বয়ংক্রিয় প্রযুক্তি ও আনম্যানড এরিয়াল সিস্টেমসের মতো দ্রুত বিকাশমান ক্ষেত্রে বাংলাদেশের শিক্ষার্থীদের আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতায় সক্ষমতা প্রদর্শনের সুযোগ আরও বিস্তৃত হওয়ার সম্ভাবনা তৈরি করেছে।
প্রথমবার অংশ নিয়েই বিশ্বে চতুর্থ স্থান অর্জনের মাধ্যমে ইউআইইউ’র ইউএআরটি শুধু একটি আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতায় সাফল্য অর্জন করেনি, বরং বাংলাদেশের শিক্ষার্থীদের উদ্ভাবনী সক্ষমতাকে বিশ্বদরবারে তুলে ধরার একটি নতুন দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে।
যোগফল ডেস্ক

আপনার মতামত লিখুন